সংস্কৃতসাহিত্যের ইতিহাস (বাংলায়) ১. ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে রামায়ণের প্রভাব
সংস্কৃতসাহিত্যের ইতিহাস (বাংলায়)
১. ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে রামায়ণের প্রভাব
ভূমিকা— ‘রামচরিতম্’, ‘সীতাচরিতম্’, ‘রঘুবীরচরিতম্’, ‘পৌলস্ত্যবধম্’, ‘ভার্গবগীতম্’ ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত যে কাব্য
ভারতীয় সংকৃতির অন্যতম মূল স্তম্ভস্বরূপ, তাই আদিকবি বাল্মীকির অপূর্ব মহাকাব্য
রামায়ণ। দেবর্ষি নারদের মুখ থাকে রামোপাখ্যান শুনে ব্রহ্মার নির্দেশে বাল্মীকি এই
কাব্য রচনা করেন। এই কাব্যে সাতটি কাণ্ড আছে। যেমন—বালকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড,
অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, যুদ্ধকাণ্ড (লঙ্কাকাণ্ড) ও
উত্তরকাণ্ড।
ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে রামায়ণের প্রভাব—
ভারতবর্ষের সমাজজীবনে রামায়ণের প্রভাব বহু ব্যাপক। স্বধর্ম ও কর্তব্যনিষ্ঠার
মূর্ত প্রতীক রামচন্দ্র। তাঁর পিতৃভক্তি, সত্যনিষ্ঠা, সংযম, ধৈর্য, পৌরুষতেজ এবং
প্রজারক্ষণের মাহাত্ম্যে তিনি দেবতারূপে পূজিত। ভারতীয় হিন্দুরা অনেক সময়েই
কুশল-বিনিময়ের সময়, বিপদের সময়, এমন কি অশরীরীদের থেকে ভয়ের ক্ষেত্রেও রামের নাম
উচ্চারণ করেন। খারাপ কিছু বোঝাতেও রামের নাম উচ্চারণ করেন। যেমন—ছি ছি! রাম রাম!
কোন কাজ ভণ্ডুল হলেও বলে—‘এ রাম!’
সীতা পতিব্রতা নারীরূপে প্রাতঃস্মরণীয়া। ভ্রাতৃভক্তি ও আনুগত্যের মূর্ত প্রতীক
ভরত ও লক্ষ্মণ। রামায়ণ ধর্মগ্রন্থ হিসাবে সর্বত্র শ্রদ্ধা সহকারে পূজিত হয়। নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রামায়ণের শ্লোক আবৃত্তি করা হয়। রামায়ণের উচ্চ আদর্শ আমাদের সমাজ ও জীবনের পথপ্রদর্শক। এই আদর্শ সমাজকল্যাণে আমাদের গৃহধর্মকে এক অখণ্ড সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে।
অটল প্রভুভক্তির জন্য হনুমানও মন্দিরে মন্দিরে পূজিত। ভারতবর্ষের মানুষ
রামরাজ্যকেই আদর্শ শাসনব্যবস্থা বলে মনে করে। এই রামরাজ্য বলতে একটা সুখ-সমৃদ্ধ, সচ্ছল
ও সুন্দর জীবনকেই বোঝায়। সূত ও চারণগণ মুখে মুখে যে রামায়ণ-কাহিনী প্রচার করত, তা
থেকেই প্রচলিত হয়েছিল লোকায়ত রামায়ণ পালাগানের।
দৈনন্দিন জীবনেও রামায়ণের প্রভাব অপরিসীম। ভারতবর্ষে শুভশক্তির প্রতীকরূপে
রামকে এবং অশুভ শক্তির প্রতীকরূপে রাবণকে দেখা হয়। কোন বিশ্বাসঘাতক স্বজনকে বলা হয়
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। অত্যধিক অহংকারীর বিনাশ বোঝাতে বলা হয় ‘অতিদর্পে
হতা লঙ্কা’। কুমন্ত্রণা দানকারীকে মন্থরার সঙ্গে তুলনা করা হয়। এইভাবে দেখা
যায়—রামায়ণ আমাদের জীবনধারাকে গভীরভাবে বেঁধে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছেন—
‘এই রামায়ণকথা হইতে ভারতবর্ষের আবালবৃদ্ধবনিতা আপামরসাধারণ যে শিক্ষা পাইয়াছে
তাহা নহে, আনন্দ পাইয়াছে; কেবল যে ইহাকে শিরোধার্য করিয়াছে তাহা নহে, ইহাকে হৃদয়ের
মধ্যে রাখিয়াছে; ইহা যে কেবল তাহাদের ধর্মশাস্ত্র তাহা নহে, ইহা তাহাদের কাব্য’।
ভারতীয় সাহিত্যে রামায়ণের প্রভাব—
ভারতবর্ষের অনেক কবি সাহিত্যিক, বিশেষ করে সংস্কৃত
কবিগণ রামায়ণ থেকে তাঁদের রচনার উপাদান সংগ্রহ করেছেন। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর
ভাস থেকে শুরু করে সপ্তদশ শতকের রামভদ্র দীক্ষিত পর্যন্ত অনেক কবি-নাট্যকার
রামায়ণের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
রামায়ণ অবলম্বনে রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক—
ভাসের প্রতিমা ও অভিষেক, ভবভূতির
মহাবীরচরিত ও উত্তররামচরিত, অনঙ্গহর্ষের উদাত্তরাঘব, শক্তিভদ্রের আশ্চর্যচূড়ামণি,
মুরারির অনর্ঘরাঘব, দিঙ্নাগের কুন্দমালা, রাজশেখরের বালরামায়ণ, জয়দেবের
প্রসন্নরাঘব, দামোদর মিশ্র বা মধুসূদন মিশ্র কর্তৃক সঙ্কলিত হনুমন্নাটক প্রভৃতি।
রামায়ণ অবলম্বনে রচিত উল্লেখযোগ্য মহাকাব্য—
কালিদাসের রঘুবংশ, ভর্তৃহরির বা ভট্টির রাবণবধ বা ভট্টিকাব্য, কুমারদাসের জানকীহরণ, অভিনন্দের রামচরিত, ক্ষেমেন্দ্রের রামায়ণ মঞ্জরী প্রভৃতি।
রামায়ণ অবলম্বনে রচিত উল্লেখযোগ্য চম্পূকাব্য—
রামায়ণ অবলম্বনে অনেক চম্পূকাব্য
রচিত হয়েছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—ভোজের রামায়ণচম্পূ, রামকবির রামাভ্যুদয়,
শ্রীনিবাসের রামকথাসুধোদয়, দিবাকরের অমোঘরাঘব, অনন্তাচার্যের চম্পূরাঘব, দেবরাজের
রামাভিষেক, পতঞ্জলির সীতাবিজয়চম্পূ, রামস্বামীর সীতাচম্পূ প্রভৃতি।
এছাড়া অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিতকাব্যে, কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটকের অঙ্গুরীয়ক
বৃত্তান্তে, মেঘদূতে মেঘের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণের উপর রামায়ণের প্রভাব লক্ষ করা
যায়।
রামায়ণের ধর্মীয় তত্ত্ব ও আদর্শ অবলম্বনে রচিত কিছু গ্রন্থ--
রামায়ণের ধর্মীয় তত্ত্ব ও আদর্শ
অবলম্বনে পরবর্তী কালে কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—অদ্ভুত
রামায়ণ, অধ্যাত্ম রামায়ণ, আনন্দ রামায়ণ, তত্ত্বসংগ্রহ রামায়ণ, ভুশুণ্ডি রামায়ণ,
মন্ত্ররামায়ণ প্রভৃতি।
বৌদ্ধ সাহিত্যে রামায়ণের প্রভাব--
রামায়ণের ধর্মীয় তত্ত্ব অবলম্বনে রচিত বৌদ্ধ
সাহিত্যে কিছু কাহিনী পাওয়া যায়। এগুলি মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—পালিজাতকের
‘জাতকত্থবণ্ণনা’ এবং সুত্তপিটকের ‘খুদ্দকণিকায়’।
রামায়ণ অবলম্বনে রচিত উল্লেখযোগ্য জৈনগ্রন্থ—
বিমল সূরিরই ‘পউমচরিও’,
গুণভদ্রের উত্তরপুরাণ, রবিসেনের পদ্মচরিত, জিন্দাসের রামদেবপুরাণ, ভীমসেনের
রামচরিত প্রভৃতি।
প্রাদেশিক সাহিত্যে রামায়ণের প্রভাব—
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাদেশিক
সাহিত্যের উপর রামায়ণের প্রভাব যথেষ্ট।তামিল ভাষায় ‘কম্ব রামায়ণ’, কানাড়া ভাষায়
‘তোরবেয় রামায়ণ’, হিন্দি ভাষায় ‘রামচরিতমানস’ প্রভৃতি বেশ জনপ্রিয়। বাংলায়
কৃত্তিবাস-রচিত রামায়ণ ঘরে ঘরে পঠিত হয়। এছাড়া গুজরাতী, মারাঠী, তেলেগু, মালয়ালম
প্রভৃতি ভাষার সাহিত্যেও রামায়ণের প্রভাব বহু ব্যাপক।
বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধকাব্য, গিরীশ ঘোষের রাবণবধ, সীতার
বনবাস, সীতাহরণ প্রভৃতিতে রামায়ণের প্রভাব যথেষ্ট। রবীন্দ্রনাথও রামায়ণের দ্বারা
অনেক প্রভাবিত হয়েছেন।
উপসংহার—রামায়ণ পুরনো হলেও তার কথা কখনও পুরনো হয় না। নতুন যুগে নতুন মূল্যবোধের
নিরিখে তা নিত্য নবায়িত হয়ে ওঠে। তাই তার আকর্ষণ সর্বকালে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—‘আজিও
সে গীত মহাসঙ্গীতে বাজে মানবের কানে’। আমাদের আশা যুগে যুগে এই মহাসঙ্গীত
মানবের কানে কানে বাজবে এবং ব্রহ্মার যে বাণী চিরন্তনী তা মূর্ত হয়ে উঠবে—
‘যাবত্ স্থাস্যন্তি গিরয়ঃ সরিতশ্চ মহীতলে।
তাবদ্রামায়ণী কথা লোকেষু প্রচরিষ্যতি’’।
-----
Comments
Post a Comment