‘’কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’’
‘’কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’’
(কর্মণি এব অধিকারঃ তে মা ফলেষু কদাচন)
এর আক্ষরিক মানে—কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয়।
এটা আবার হয় নাকি? আমি কাজ করব আর ফল পাব না? এ কেমন ধারা কথা? আমরা জানি-- যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কাজের ভাল ফল, খারাপ কাজের খারাপ ফল। কাজের ফলই যদি না পাওয়া যায় তাহলে লোকে কি কাজ করবে? ভূতের বেগার কেউ কি খাটতে চায়? যদি কেউ ফলের আশা না করে শুধু কাজ করে যায়, তাহলে এটাকে কি ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ বলে না? আমি পরীক্ষা দিলাম, তার ফলে আমার কোন অধিকার নেই? আমি চাকরি পেলাম তার ফলে (মাইনেতে) আমার কোন অধিকার নেই? আমি বাড়ি করলাম তাতে আমার কোন অধিকার নেই? নিঃসন্তান দম্পতী সন্তানের আশা করবে না? সঙ্গত প্রশ্ন। সত্যিই তো। গীতা কী সব উল্টো –পাল্টা কথা বলেছে ! যত সব অবাস্তব কথা। গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
গোলকধাঁধাই বটে। গীতার কথা বুঝতে হলে একটু তলিয়ে যে ভাবতে হবে বন্ধু। আমিও যে বেশী কিছু বুঝি তা কিন্তু মোটেই নয়। আমি আমার ক্ষুদ্র চিন্তা-ভাবনা দিয়ে উক্ত বাক্যটির অর্থ যেভাবে বুঝেছি তাই আপনাদের কাছে তুলে ধরছি। আপনারা যদি অন্যরকম ভাবেন, তাহলে নিজের মতামত অবশ্যই জানাবেন।
দেখুন, গীতাকে সর্বশাস্ত্রের সার বলা হয়। এর এক একটি কথার তাৎপর্য অনেক গভীর। সেইরকমই একটি কথা—
‘’কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।’’
এই বাক্যের মূল ব্যাখ্যা আধ্যাত্মিক পক্ষে, আর একটি ব্যাখ্যা আমাদের বাস্তব জীবনের পক্ষে। আমার মতে বাস্তব জীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আসলে আধ্যাত্মিক জীবনের যারা সন্ধান পেয়েছেন তাদের কাছে সেটাই বাস্তব। আবার যারা তা পান নি, তাদের কাছে তা অবাস্তব। সাধারণ বুদ্ধিতে এর নির্ণয় করা সত্যিই কঠিন।
আমি প্রথমে আধ্যাত্মিক দিক থেকে একটু বলার চেষ্টা করছি। অধিকাংশ ভারতীয় দর্শন শাস্ত্র অনুসারে আমাদের জীবন কর্মফলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কর্মফলবাদ ও জন্মান্তরবাদ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কর্মফলবাদ অনুসারে কর্ম তিন প্রকার—প্রারব্ধ কর্ম, সঞ্চিত কর্ম ও সঞ্চীয়মান কর্ম। আমাদের বর্তমান জন্ম প্রারব্ধ কর্মের ফল। অতীত কর্ম থেকে উৎপন্ন সঞ্চিত কর্ম যার ফলভোগ এখনো শুরু হয় নি। বর্তমান জীবনের কর্মকে সঞ্চীয়মান কর্ম বলে। ভবিষ্যতে এর ফল ভোগ করতে হবে।
আমাদের পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মফল নিয়ে বর্তমান জন্ম। যে কর্মের ফল জমা হয়ে আছে এবং জমা হবে তার ফলভোগ পরবর্তী জন্মে ভোগ করতে হবে। এই কর্মফল ভোগ থেকে কারো নিস্তার নেই। কর্মফলবাদ অনুসারে মানুষ কামনাবাসনা দ্বারা তাড়িত হয়ে যে কাজ করে তার ফল ভোগ অবশ্যই তাকে করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন—যদি কারো এক টুকরো মিছরি খাওয়ারও বাসনা থাকে, তাহলেও তাকে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এইভাবে মানুষ ক্রমাগত কামনামূলক কর্ম করে করে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে (ভবচক্রে) আবর্তিত হয়। সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নানারকম দুঃখ কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করে। মানুষের অন্তরাত্মা প্রতিনিয়ত এই জীবন থেকে মুক্তি চায়। আমার মনে হয়—খুব কম লোকই খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি জীবদ্দশায় মৃত্যুর মাধ্যমে নিজের মুক্তি চান নি। কেউ কেউ তো স্বাভাবিক মৃত্যুর আগেই আত্মহননের পথ বেছে নেন।
আমাদের কত ধরণের দুঃখ—আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক। প্রিয়বিচ্ছেদ ও অপ্রিয়সংযোগ থেকে মূলতঃ আমাদের দুঃখগুলি আসে। এই দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই গীতায় নিষ্কাম কর্মের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। গীতা বলেছে--আমরা কেউই এক মুহূর্তও কর্ম না থাকতে পারি না—‘ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।‘ মানুষ শুধু অঙ্গের দ্বারাই নয়, মনের দ্বারাও কর্ম করে। তাই আমাদের কর্ম তিন প্রকার—কায়িক, বাচিক ও মানসিক। সেইজন্য গীতায় কায়মনোবাক্যে সংযত হয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে—
‘যিনি মনের দ্বারা জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্ত হয়ে কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা কর্মযোগের অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ।‘
আবার কোনটা করণীয় তা যুক্তি দিয়ে বিচার করেই করতে হবে। কারণ যুক্তিহীনভাবে কাজ করলে ধর্মহানি হয়—
‘কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীন-বিচারেণ ধর্মহানিঃ প্রজায়তে।।‘ (বৃহস্পতি)
যাই হোক যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপর সবকিছু সমর্পণ করে অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তাঁদের কোন কর্মবন্ধন হয় না, ফলে তাঁরা তাড়াতাড়ি সংসার বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করেন। তবে যারা ফলের আশা করে কর্ম করেন তাদের এই সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি নেই। সেইজন্য গীতার উপদেশ-- ‘আসক্তিশূন্য হয়ে সর্বদা কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। কারণ অনাসক্ত হয়ে কর্মানুষ্ঠান করলে পুরুষ মোক্ষ লাভ করে।‘
(তস্মাদনাসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।
অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ ।।‘) গীতা—কর্মযোগ--১৯)
অনাসক্তভাবে কর্ম করলে তার ফল কর্মীকে ভোগ করতে হয় না। ধীরে ধীরে সমস্ত কামনা বিলুপ্ত হলে মানুষ চিরমুক্তি লাভ করে।
আসলে মানুষকে সমস্ত রকম দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়াই ভারতীয় অধ্যাত্ম সাধনার মূল কথা।
কেউ যদি অধ্যাত্মবাদী নাও হন তাহলেও গীতার উপদেশ তাকে পথের দিশা দেখাতে পারে। আমরা সাধারণ মানুষেরা সবসময় ভাল ফল চাই। আমার ভাল রেজাল্ট চাই, ভাল চাকরী চাই, বাড়ি চাই, গাড়ি চাই, এটা চাই, ওটা চাই, আরো কত কী চাই তা আমরা নিজেরাই জানি না। অথচ দেখুন ঐ সব ভাল ভাল জিনিস পাওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার তা সকলে ঠিকমতো করে? যে অধ্যবসায় দরকার তা কি সকলের সমান থাকে?, যে নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা দরকার তা কি সকলে মানে? যে মেধা দরকার তা কি সকলের সমান থাকে? থাকে না। ফলে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে ব্যবধানটা বেশী হয়ে যায়। আমরা কষ্ট পাই।
আবার ঐসব কিছু থাকলেও অনেক সময় আমাদের প্রাপ্য জিনিস আমরা পাই না। অনেক ফ্যাক্টর এর জন্য দায়ী। আমরা কোন যুক্তিতেই এটা মেনে নিতে পারি না। আমরা হতাশ হই, দুঃখ পাই। অনেকে ভাগ্যের দোষ দেয়। অনেকে এর জন্য সারাজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে।
আমাদের সমাজে এমন খুব কম লোকই খুঁজে পাওয়া যাবে যারা তাদের বর্তমান অবস্থায় সুখী। জীবনে তাদের কি হওয়া উচিৎ ছিল, কি হয়েছেন এই ভেবে ভেবেই অনেকের সময় কাটে। আবার যারা সফল তাদেরও কত ধরণের অশান্তি! এই সব কিছুর মূলেই আছে আমাদের ফলাকাঙ্ক্ষা। সেইজন্যই গীতার উক্ত উপদেশ।
মানুষকে স্থিরবুদ্ধি হওয়ার জন্য গীতায় অনেক উপদেশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলি জীবনে একটু পালন করলে আশা করি লাভ বই ক্ষতি হবে না।
কেউ কেউ বলেন—শাস্ত্রগুলি জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের সমাজের বুকে চেপে বসেছে। আমাদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। আমি বলি শাস্ত্র মানুষকে যথার্থ পথই দেখায়। মানুষই কিছু শাস্ত্রবাক্যের অপব্যাখ্যা করে, অপপ্রয়োগ করে জগদ্দল পাথর বানিয়ে দিয়েছে। মানুষের প্রয়োজনেই সব কিছু। মানুষের কল্যাণের জন্য অনেক বিষয়ের নতুন ব্যাখ্যা, নতুন মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়। গভীর মনীষা দ্বারা সেই সব শাস্ত্রবাক্যের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে মানুষই বঞ্চিত হয়। পুরনো সব কিছু ভাল, তা নয়। যা ভাল তাই গ্রহণ করতে হয়, মন্দটা ত্যাগ করতে হয়। আমাদের শাস্ত্রেও ভালমন্দ মিশে আছে। সেইজন্য যুক্তি দিয়ে বিচার করে ভালটাকেই গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য তো বইগুলি ভালভাবে পড়া দরকার, তা না হলে বিচার করা যাবে কীভাবে?
(কর্মণি এব অধিকারঃ তে মা ফলেষু কদাচন)
এর আক্ষরিক মানে—কর্মেই তোমার অধিকার, ফলে কখনো নয়।
এটা আবার হয় নাকি? আমি কাজ করব আর ফল পাব না? এ কেমন ধারা কথা? আমরা জানি-- যেমন কর্ম তেমন ফল। ভাল কাজের ভাল ফল, খারাপ কাজের খারাপ ফল। কাজের ফলই যদি না পাওয়া যায় তাহলে লোকে কি কাজ করবে? ভূতের বেগার কেউ কি খাটতে চায়? যদি কেউ ফলের আশা না করে শুধু কাজ করে যায়, তাহলে এটাকে কি ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ বলে না? আমি পরীক্ষা দিলাম, তার ফলে আমার কোন অধিকার নেই? আমি চাকরি পেলাম তার ফলে (মাইনেতে) আমার কোন অধিকার নেই? আমি বাড়ি করলাম তাতে আমার কোন অধিকার নেই? নিঃসন্তান দম্পতী সন্তানের আশা করবে না? সঙ্গত প্রশ্ন। সত্যিই তো। গীতা কী সব উল্টো –পাল্টা কথা বলেছে ! যত সব অবাস্তব কথা। গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
গোলকধাঁধাই বটে। গীতার কথা বুঝতে হলে একটু তলিয়ে যে ভাবতে হবে বন্ধু। আমিও যে বেশী কিছু বুঝি তা কিন্তু মোটেই নয়। আমি আমার ক্ষুদ্র চিন্তা-ভাবনা দিয়ে উক্ত বাক্যটির অর্থ যেভাবে বুঝেছি তাই আপনাদের কাছে তুলে ধরছি। আপনারা যদি অন্যরকম ভাবেন, তাহলে নিজের মতামত অবশ্যই জানাবেন।
দেখুন, গীতাকে সর্বশাস্ত্রের সার বলা হয়। এর এক একটি কথার তাৎপর্য অনেক গভীর। সেইরকমই একটি কথা—
‘’কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।’’
এই বাক্যের মূল ব্যাখ্যা আধ্যাত্মিক পক্ষে, আর একটি ব্যাখ্যা আমাদের বাস্তব জীবনের পক্ষে। আমার মতে বাস্তব জীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আসলে আধ্যাত্মিক জীবনের যারা সন্ধান পেয়েছেন তাদের কাছে সেটাই বাস্তব। আবার যারা তা পান নি, তাদের কাছে তা অবাস্তব। সাধারণ বুদ্ধিতে এর নির্ণয় করা সত্যিই কঠিন।
আমি প্রথমে আধ্যাত্মিক দিক থেকে একটু বলার চেষ্টা করছি। অধিকাংশ ভারতীয় দর্শন শাস্ত্র অনুসারে আমাদের জীবন কর্মফলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কর্মফলবাদ ও জন্মান্তরবাদ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কর্মফলবাদ অনুসারে কর্ম তিন প্রকার—প্রারব্ধ কর্ম, সঞ্চিত কর্ম ও সঞ্চীয়মান কর্ম। আমাদের বর্তমান জন্ম প্রারব্ধ কর্মের ফল। অতীত কর্ম থেকে উৎপন্ন সঞ্চিত কর্ম যার ফলভোগ এখনো শুরু হয় নি। বর্তমান জীবনের কর্মকে সঞ্চীয়মান কর্ম বলে। ভবিষ্যতে এর ফল ভোগ করতে হবে।
আমাদের পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মফল নিয়ে বর্তমান জন্ম। যে কর্মের ফল জমা হয়ে আছে এবং জমা হবে তার ফলভোগ পরবর্তী জন্মে ভোগ করতে হবে। এই কর্মফল ভোগ থেকে কারো নিস্তার নেই। কর্মফলবাদ অনুসারে মানুষ কামনাবাসনা দ্বারা তাড়িত হয়ে যে কাজ করে তার ফল ভোগ অবশ্যই তাকে করতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন—যদি কারো এক টুকরো মিছরি খাওয়ারও বাসনা থাকে, তাহলেও তাকে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এইভাবে মানুষ ক্রমাগত কামনামূলক কর্ম করে করে জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে (ভবচক্রে) আবর্তিত হয়। সংসার-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নানারকম দুঃখ কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা ভোগ করে। মানুষের অন্তরাত্মা প্রতিনিয়ত এই জীবন থেকে মুক্তি চায়। আমার মনে হয়—খুব কম লোকই খুঁজে পাওয়া যাবে যিনি জীবদ্দশায় মৃত্যুর মাধ্যমে নিজের মুক্তি চান নি। কেউ কেউ তো স্বাভাবিক মৃত্যুর আগেই আত্মহননের পথ বেছে নেন।
আমাদের কত ধরণের দুঃখ—আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক। প্রিয়বিচ্ছেদ ও অপ্রিয়সংযোগ থেকে মূলতঃ আমাদের দুঃখগুলি আসে। এই দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই গীতায় নিষ্কাম কর্মের উপদেশ দেওয়া হয়েছে। গীতা বলেছে--আমরা কেউই এক মুহূর্তও কর্ম না থাকতে পারি না—‘ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।‘ মানুষ শুধু অঙ্গের দ্বারাই নয়, মনের দ্বারাও কর্ম করে। তাই আমাদের কর্ম তিন প্রকার—কায়িক, বাচিক ও মানসিক। সেইজন্য গীতায় কায়মনোবাক্যে সংযত হয়ে কাজ করার কথা বলা হয়েছে—
‘যিনি মনের দ্বারা জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি সংযত করে অনাসক্ত হয়ে কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা কর্মযোগের অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ।‘
আবার কোনটা করণীয় তা যুক্তি দিয়ে বিচার করেই করতে হবে। কারণ যুক্তিহীনভাবে কাজ করলে ধর্মহানি হয়—
‘কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।
যুক্তিহীন-বিচারেণ ধর্মহানিঃ প্রজায়তে।।‘ (বৃহস্পতি)
যাই হোক যারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপর সবকিছু সমর্পণ করে অনাসক্তভাবে কর্ম করেন তাঁদের কোন কর্মবন্ধন হয় না, ফলে তাঁরা তাড়াতাড়ি সংসার বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করেন। তবে যারা ফলের আশা করে কর্ম করেন তাদের এই সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি নেই। সেইজন্য গীতার উপদেশ-- ‘আসক্তিশূন্য হয়ে সর্বদা কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। কারণ অনাসক্ত হয়ে কর্মানুষ্ঠান করলে পুরুষ মোক্ষ লাভ করে।‘
(তস্মাদনাসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।
অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ ।।‘) গীতা—কর্মযোগ--১৯)
অনাসক্তভাবে কর্ম করলে তার ফল কর্মীকে ভোগ করতে হয় না। ধীরে ধীরে সমস্ত কামনা বিলুপ্ত হলে মানুষ চিরমুক্তি লাভ করে।
আসলে মানুষকে সমস্ত রকম দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়াই ভারতীয় অধ্যাত্ম সাধনার মূল কথা।
কেউ যদি অধ্যাত্মবাদী নাও হন তাহলেও গীতার উপদেশ তাকে পথের দিশা দেখাতে পারে। আমরা সাধারণ মানুষেরা সবসময় ভাল ফল চাই। আমার ভাল রেজাল্ট চাই, ভাল চাকরী চাই, বাড়ি চাই, গাড়ি চাই, এটা চাই, ওটা চাই, আরো কত কী চাই তা আমরা নিজেরাই জানি না। অথচ দেখুন ঐ সব ভাল ভাল জিনিস পাওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার তা সকলে ঠিকমতো করে? যে অধ্যবসায় দরকার তা কি সকলের সমান থাকে?, যে নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা দরকার তা কি সকলে মানে? যে মেধা দরকার তা কি সকলের সমান থাকে? থাকে না। ফলে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে ব্যবধানটা বেশী হয়ে যায়। আমরা কষ্ট পাই।
আবার ঐসব কিছু থাকলেও অনেক সময় আমাদের প্রাপ্য জিনিস আমরা পাই না। অনেক ফ্যাক্টর এর জন্য দায়ী। আমরা কোন যুক্তিতেই এটা মেনে নিতে পারি না। আমরা হতাশ হই, দুঃখ পাই। অনেকে ভাগ্যের দোষ দেয়। অনেকে এর জন্য সারাজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে।
আমাদের সমাজে এমন খুব কম লোকই খুঁজে পাওয়া যাবে যারা তাদের বর্তমান অবস্থায় সুখী। জীবনে তাদের কি হওয়া উচিৎ ছিল, কি হয়েছেন এই ভেবে ভেবেই অনেকের সময় কাটে। আবার যারা সফল তাদেরও কত ধরণের অশান্তি! এই সব কিছুর মূলেই আছে আমাদের ফলাকাঙ্ক্ষা। সেইজন্যই গীতার উক্ত উপদেশ।
মানুষকে স্থিরবুদ্ধি হওয়ার জন্য গীতায় অনেক উপদেশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলি জীবনে একটু পালন করলে আশা করি লাভ বই ক্ষতি হবে না।
কেউ কেউ বলেন—শাস্ত্রগুলি জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের সমাজের বুকে চেপে বসেছে। আমাদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। আমি বলি শাস্ত্র মানুষকে যথার্থ পথই দেখায়। মানুষই কিছু শাস্ত্রবাক্যের অপব্যাখ্যা করে, অপপ্রয়োগ করে জগদ্দল পাথর বানিয়ে দিয়েছে। মানুষের প্রয়োজনেই সব কিছু। মানুষের কল্যাণের জন্য অনেক বিষয়ের নতুন ব্যাখ্যা, নতুন মূল্যায়ন প্রয়োজন হয়। গভীর মনীষা দ্বারা সেই সব শাস্ত্রবাক্যের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে মানুষই বঞ্চিত হয়। পুরনো সব কিছু ভাল, তা নয়। যা ভাল তাই গ্রহণ করতে হয়, মন্দটা ত্যাগ করতে হয়। আমাদের শাস্ত্রেও ভালমন্দ মিশে আছে। সেইজন্য যুক্তি দিয়ে বিচার করে ভালটাকেই গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য তো বইগুলি ভালভাবে পড়া দরকার, তা না হলে বিচার করা যাবে কীভাবে?
Comments
Post a Comment