পুরাণসাহিত্য—
3. পুরাণসাহিত্য—
পুরাণসাহিত্য হচ্ছে ভারতীয় সংস্কৃতি মূলাধার। ‘পুরাণ’
শব্দের অর্থ প্রাচীন কথা। ব্রাহ্মণসাহিত্যে ও উপনিষদে ‘ইতিহাসপুরাণ’ শব্দের উল্লেখ
করা হয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে আখ্যান, উপাখ্যান, পুরাণ, ইতিহাস প্রায় সমার্থকরূপে
ব্যবহৃত হয়েছে। অমরকোষে বলা হয়েছে—‘পুরাণং পঞ্চলক্ষণম্’।
প্রাচীন
পুরাণগুলিতে প্রদত্ত সংঞ্জা অনুযায়ী পুরাণ হল পুরাকালের বিবরণ। যেহেতু পুরাকালে বা
অতীতে এইরকম ঘটেছিল, তাই এর নাম পুরাণ— ‘পুরাতনস্য কল্পস্য
পুরাণানি বিদুর্বুধাঃ’ (মৎস্যপুরাণ)। ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণের পার্থক্য আছে। নিরুক্তকারদের মতে
ইতিহাস ও পুরাণ শব্দের অর্থ—
‘পুরাণং কস্মাৎ? পুরা নবং ভবতি।
‘নিদানভূতম্ ইতি হ এবমসীৎ ইতি যত্র
উচ্যতে স ইতিহাসঃ’।
বিখ্যাত পুরাণ গবেষক পণ্ডিত Pargiter বলেছেন-- Purāņa means any ‘old tale' or ‘ancient lore' generally, and Itihāsa would
seen properly to denote a story of fact in accordance with its derivation ʻइति ह आसʼ,
which rather denotes actual transitional history.’
পুরাণের শ্রেণীবিভাগ—
সমগ্র পুরাণ সাহিত্যকে মহাপুরাণ ও উপপুরাণ ভেদে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মহাপুরাণ ১৮ টি এবং উপপুরাণও ১৮টি।
১৮টি মহাপুরাণ যথা—ব্রহ্ম, পদ্ম, বিষ্ণু, শিব বা বায়ু, ভাগবত, নারদীয়, মার্কণ্ডেয়, আগ্নেয়, ভবিষ্য বা ভবিষ্যৎ, ব্রহ্মবৈবর্ত, লিঙ্গ, বরাহ, বামন, কূর্ম, মৎস্য, গরুড় ও ব্রহ্মাণ্ড।
১৮টি উপপুরাণ—উপপুরাণ সম্বন্ধে মতভেদ আছে। বৃহদ্ধর্মপুরাণের মতে উপপুরাণগুলি হল—
আদি, আদিত্য, বৃহন্নারদীয়, নন্দীশ্বর, বৃহন্নন্দীশ্বর, শাম্ব, ক্রিয়াযোগসার, কালিকা, ধর্ম, বিষ্ণুধর্মোত্তর, শিবধর্ম, বিষ্ণুধর্ম, বামন, বারুণ, নারসিংহ, ভা্র্গব এবং বৃহদ্ধর্ম।
মৎস্যপুরাণে পুরাণগুলিকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে—
১. রাজস্— ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মবৈবর্ত, মার্কণ্ডেয়, ভবিষ্য ও বামন এই ভাগের অন্তর্গত। এই পুরাণগুলিতে ব্রহ্মার প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে।
২. সাত্ত্বিক—ভাগবত, নারদীয়, গরুড়, পদ্ম, বরাহ ও বিষ্ণু এই ভাগের অন্তর্গত। এই পুরাণগুলিতে বিষ্ণুর প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে।
৩. তামস্—শিব, লিঙ্গ, স্কন্দ, আগ্নেয়, মৎস্য ও কূর্ম এই ভাগের অন্তর্গত। এই পুরাণগুলিতে শিবের প্রাধান্য স্বীকৃত হয়েছে।
৪. সঙ্কীর্ণ—মূলতঃ কিছু উপপুরাণ এর অন্তর্গত। এখানে সরস্বতী ও পিতৃগণের মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে।
মহাপুরাণের বৈশিষ্ট্য—
সাধারণভাবে পুরাণের পাঁচটি লক্ষণ স্বীকৃত হয়েছে। এই সম্বন্ধে বায়ুপুরাণ ও বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে--
‘সর্গশ্চ প্রতিসর্গশ্চ বংশো মন্বন্তরাণি চ।
বংশানুচরিতঞ্চৈব পুরাণং পঞ্চলক্ষণম্’।।
সর্গ মানে সৃষ্টি। প্রতিসর্গ—প্রলয়ের পর নতুন সৃষ্টি। বংশ—দেবতা ও ঋষিদের বংশাবলী। মন্বন্তর—এক এক মনুর শাসনকাল। বংশানুচরিত—রাজবংশগুলির ইতিহাস।
উক্ত পাঁচটি লক্ষণ সম্বন্ধে সমস্ত পুরাণ একমত নয়। মৎস্যপুরাণে আরো ব্যাপকভাবে পুরাণের লক্ষণ করা হয়েছে—
‘উৎপত্তিং প্রলয়ঞ্চৈব বংশান্ মন্বন্তরাণি চ।
বংশানুচরিতঞ্চৈব ভুবনস্য বিস্তরম্।।
দানধর্মবিধিঞ্চৈব শ্রাদ্ধকল্পঞ্চ শাশ্বতম্।
বর্ণাশ্রমবিভাগঞ্চ তথেষ্টাপূর্তসংজ্ঞিতম্।।
দেবতানাং প্রতিষ্ঠাদি যচ্চান্যদ্ বিদ্যতে ভুবি।
তৎসর্বং বিস্তরেণ ত্বং ধর্মং ব্যাখ্যাতুমর্হসি’।।
এখানে সর্গাদির অতিরিক্ত ভুবনবিস্তার, দানধর্ম, শ্রাদ্ধকল্প, বর্ণাশ্রমবিভাগ, ইষ্টাপূর্ত ও দেবতাপ্রতিষ্ঠা নামে আরো ছয়টি লক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
বিষয়বস্তুর বিচারে মহাপুরাণ ও উপপুরাণগুলির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মূল পুরাণ রচনার পর অন্যান্য অনেক বিষয় ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যেমন—জ্যোতিষ, শ্রাদ্ধকল্প, কৃষি, পশুপালন, বাণিজ্যকর্ম, আয়ুর্বেদ, ব্যাকরণ, ছন্দ, ভূগোল, অস্ত্রবিদ্যা, শারীরবিদ্যা প্রভৃতি।
পুরাণগুলির গুরুত্ব—
ঐতিহাসিক মূল্য—
পুরাণগুলির ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। পুরাণে প্রাচীন রাজাদের মধ্যে স্বায়ম্ভূব, দক্ষ প্রাচেতস্, বৈবস্বত, মান্ধাতা, সগর, রাম প্রমুখ রাজাদের বিবরণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বৃহদ্রথবংশ, প্রদ্যোতবংশ, শিশুনাগবংশ, নন্দবংশ, মৌর্যবংশ, শুঙ্গবংশ, কণ্ববংশ, আন্ধ্রভৃত্যবংশ ও গুপ্তবংশের বিবিরণও পাওয়া যায়। এছাড়া উক্ত রাজবংশগুলির সমসাময়িক আভীর, শক, যবন, তুষার, হূণ প্রভৃতি শূদ্র ও ম্লেচ্ছ রাজবংশের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে একথা ঠিক যে, রাজবংশগুলির ইতিহাস বর্ণনায় কোন কোন ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন, ভ্রম-প্রমাদ এবং কল্পনাবিলাসও আছে।
পুরাণের ধর্মীয় গুরুত্ব—
হিন্দুধর্মের দুটি প্রধান ধারা—বৈদিকধর্ম ও পৌরাণিক ধর্ম।
পুরাণগুলিতে ব্রাহ্ম, পাঞ্চরাত্র, বৈষ্ণব, ভাগবত, শৈব, পাশুপত, গাণপত্য, শাক্ত
প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের সামাজিক ইতিহাস পাওয়া যায়। এখানে বেদানুসারী
সাংখ্য, বেদান্ত প্রভৃতি দার্শনিক মতবাদের পাশাপাশি বেদবিরোধী কিছু মতবাদও স্থান
পেয়েছে। এখানে লোকধর্মেরও বিশিষ্ট রূপ দেখা যায়। পৌরাণিকমতে সত্য ও অহিংসাই
শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সত্য শুধু অধ্যাত্মচেতনা নয়, এটা কায়িক-বাচিক-মানসিক বিশুদ্ধিকরণ।
পুরাণমতে অহিংসা, ক্ষমা, ক্ষান্তি, শম, দম, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, দয়া, দান, শৌচ, তপঃ,
সত্য, বিদ্যা, ত্যাগ, অক্রোধ, অস্তেয়, ধ্যান, দেবতাপূজা ইত্যাদি মহদ্ধর্ম।
এইভাবে পরিবর্তিত যুগধারায়
ধর্মাচার ও সামাজিক কাঠামোতে যে সব বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়েছিল, পুরাণগুলি সেগুলির
মধ্যে অপূর্ব সামঞ্জস্য বিধান করেছিল।
ভারতীয় সাহিত্যে
পুরাণের প্রভাব—
লৌকিক সংস্কৃতের বিভিন শাখায় ও
আধুনিক ভারতীয় অন্যান্য ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলিতে পুরাণজাতীয় আখ্যানের প্রভাব দেখা
যায়। হরিবংশ গ্রন্থটিকে অনেকে পুরাণ বলে মেনে নিয়েছেন। হেমাদ্রি, শূলপাণি, বাচস্পতি
মিশ্র প্রমুখের গ্রন্থ, হরবিজয়, শ্রীকণ্ঠচরিত, হরচরিতচিন্তামণি, দশাবতারচরিত,
শিবশীলার্ণব প্রভৃতি কাব্যে পুরাণের অনেক বিষয় গৃহীত হয়েছে। মধ্যযুগের অধিকাংশ
কাব্য ও নাটক পুরাণ-বর্ণিত উপাখ্যানের দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে। বাংলা সাহিত্যেও
পুরাণের প্রভাব যথেষ্ট। বৈষ্ণব পদাবলীর কাহিনীর উৎস ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত
ও পদ্মপুরাণ।
পুরাণের ভৌগোলিক
গুরুত্ব—
প্রাচীন ভারতের সামগ্রিক
ভৌগোলিক চিত্র পুরাণে পাওয়া যায়। পুরাণের মধ্যে অসংখ্য নদ-নদী, পর্বত, তীর্থস্থান
ও জনপদের সন্ধান পাওয়া যায়। কিছু কিছু স্থানের অস্তিত্ব এখনো আছে। পুরাণে
সপ্তদ্বীপ, সপ্তসাগর ও সপ্তকুলপর্বতের বর্ণনা আছে।
উপসংহার— অনেক অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে পুরাণগুলি অনেক
গুরুত্বপূর্ণ। ভারতবর্ষের প্রকৃত ইতিহাসকে, ব্রাহ্মণ্যপ্রভাবমুক্ত জনগণের ইতিহাসকে
সংরক্ষিত করার প্রবৃত্তি ও প্রেরণার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায় পুরাণসাহিত্যে। ভারতীয়
ধর্ম, জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে সাধারণীকরণ করেছে পুরাণসাহিত্য। ভারতবর্ষের সামগ্রিক
জীবনধারাকে নতুন করে রূপদানের ক্ষেত্রে পুরাণের গুরুত্ব অপরিসীম। সেইজন্যই
মৎস্যপুরাণে বলা হয়েছে—‘পুরাণং
সর্বশাস্ত্রাণাং প্রথমং ব্রহ্মণা কৃতম্’। পুরাণের গুরুত্ব সম্পর্কে R. C. Hazra বলেছেন-- ‘Like a living organism it has undergone changes from time to time with
the changes in the social and religious life of the people and has thus been
able to preserve to an appreciable degree of materials for the study of popular
life in ancient and mediaeval India.’
----
Comments
Post a Comment