'Historical Kāvya -- the most weak point of Sanskrit literature`
'Historical
Kāvya -- the most weak point of Sanskrit literature`
সাধারণভাবে আমরা ইতিহাস
বলতে যা বুঝি প্রাচীন ভারতবর্ষে সেইরকম ইতিহাস ছিল না। বর্তমানযুগে ইতিহাসকে History-র সমার্থকরূপে ধরা হয়। The
Columbia Encyclopaedia-তে বলা হয়েছে—‘ History in its broadest
sense, is the story of man's past. More specially it means the record of that
past not only in chronicles and treaties on the past, but in all sorts of forms.’
প্রাচীনভারতে ইতিহাস শব্দটি অনেক ব্যাপক অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। ঋগ্বেদোপোদ্ঘাতে বলা হয়েছে—
‘দেবাসুরাঃ সংযত্তা আসন্নিত্যাদয়ঃ ইতিহাসঃ’।
নিরুক্তে বলা হয়েছে—‘নিদানভূত ইতি হ এবমাসীদ্ ইতি য উচ্যতে স ইতিহাসঃ’।
কৌটিল্য বলেছেন—‘পুরাণমিতিবৃত্তমাখ্যায়িকোদাহরণং ধর্মশাস্ত্রমর্থমাস্ত্রঞ্চেতি
ইতিহাসঃ’।
অমরকোষে বলা হয়েছে—‘ইতিহাসঃ পুরাবৃত্তম্’।
প্রাচীন আলোচনাগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—সংস্কৃত ইতিহাস শব্দটি আধুনিক ইতিহাস বা History–র সমার্থক নয়। ‘ইতিহাস’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি—‘ইতি হ আস’, অর্থাৎ এইরকমই ছিল। অতএব শুধুমাত্র যথাযথ বাস্তব ঘটনাই নয়, প্রাচীন কাহিনী, আখ্যান, লোককথা, কিংবদন্তী প্রভৃতি পরম্পরাক্রমে যে
অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেই সবগুলিই ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভারতবর্ষে
যথার্থ ঐতিহাসিক রচনার অভাবের কারণ—
ইতিহাস
রচনায় উদাসীনতা—
জাতি ইহসর্বস্ব না হলে কোন কিছুকে স্থায়ী করে
রাখার চেষ্টা করে না। বৈদিকযুগ থেকে আরম্ভ করে যে কয়েকটি ধর্মের স্রোত ভারতবাসীর চিন্তা
ও বোধবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করেছিল, তার মূল কথা হচ্ছে—ইহলোক ছেড়ে পরলোকের কথা চিন্তা
করা। ধর্ম ও দর্শনের প্রভাবে ভারতবাসীর বোধ, মনন, চিন্তা ও কর্ম ইহকাল ও ইহজগৎকে
ত্যাগ করতে শিখিয়েছে।
বৈদিক সাহিত্যে ধর্মীয়
চেতনা, উপনিষদের কর্মবিমুখ ভাববাদী দর্শন, জন্মান্তরবাদ ও কর্মফল বাদ, প্রধান
প্রাধান ধর্ম-দর্শনগুলির ঐহিক আদর্শ অপেক্ষা পারলৌকিক কল্যাণের জন্য অনুষ্ঠান,
ত্যাগের আদর্শ প্রভৃতি প্রভাবে জীবন সম্বন্ধে উদার দৃষ্টিভঙ্গী, ভারতবাসীদের
বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচনায় উদাসীন করেছে।
প্রতিকূল
রাজনীতি ও জাতীয়তাবোধের অভাব—
দেশ ও জাতির ইতিহাস রচনার
প্রেরণা আসে জাতীয়তাবোধ থেকে। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইতিহাস রচনার অনুকূল
ছিল না। যীশুর জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষে এক
রাজবংশের সঙ্গে অন্য রাজবংশের, বা এক অংশের সঙ্গে আর এক অংশের যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই
থাকত। ফলে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে নি।
জাতীয় সঙ্কট উপস্থিত হলে
জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে। ভারতবর্ষে তা কোনদিন ঘটে নি। আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ
করলে একমাত্র পুরু ছাড়া আর কেউ বাধা দেন নি। ফলে সুদীর্ঘকাল বিদেশীরা আমাদের দেশ
শাসন করেছে। জাতির জন্য কোন বোধ ছিল না বলে ভারতবর্ষে জাতির ইতিহাস রচিত হয় নি।
পণ্ডিত A. B.
Keith এই বিষয়ে বলেছেন—‘It may be that India
failed to produce historians because the great political events which affected
her during the period up to AD 1200’.
যথার্থ ঐতিহাসিক উপাদানের অভাব—
প্রাচীন ও মধ্যযুগের গ্রন্থাবলীতে ভারতীয় ইতিহাসের প্রাথমিক উপাদান অনেক
পাওয়া যায়। পুরাণের রাজবংশাবলীঁ, শিলালেখ, তাম্রলেখ, জৈন পট্টাবলী প্রভৃতি মধ্যে,
এছাড়া গদ্যকাব্য, চম্পূকাব্য, নাটক এবং ঐতিহাসিক ঘটনাকে অবলম্বন করে রচিত
গ্রন্থসমূহে ইতিহাসের অনেক উপাদান পাওয়া গেলেও সেগুলি সবসময় সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস নয়।
সমাজ, রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির পটভূমিকায় ঘটনাবলীর কার্যকারণ নির্ণয় করা
ঐতিহাসিকের কাজ। রাজতন্ত্র-পরিচালিত সমাজব্যবস্থায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক
ইতিহাসের উপাদান এবং রাজন্যমণ্ডলী ও তাঁদের আশ্রিত কবি-সাহিত্যিকদের জীবনযাত্রা
সম্পর্কিত তথ্যের অভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের অনেক বিষয় আমাদের কাছে অজ্ঞাত। ফলে
যথার্থ ইতিহাস রচিত হয় নি।
সংস্কৃত ভাষায় উৎকৃষ্ট ঐতিহাসিক গ্রন্থের অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু ঐতিহাসিক
দৃষ্টিভঙ্গির অভাব ছিল একথা বলা যায় না। এই বিষয়ে অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার
বলেছেন—
‘যথার্থ ইতিহাস-বোধের অভাব ছিল বলিয়াই সুপ্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ঐতিহাসিক
সাহিত্য অথবা ইতিহাসভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিরও সম্পূর্ণ অভাব ছিল না, এমন বলা চলে। অথচ
উচ্চাঙ্গ ইতিহাসলিখন-প্রণালী সম্পর্কে প্রাচীন ভারতেও প্রকৃষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বযুগে
সর্বজনগ্রাহ্য তত্ত্বের অভাব ঘটে নাই। রাজতরঙ্গিণী অথবা কাশ্মীরের ইতিহাসপ্রণেতা
কহ্লণ দ্বাদশ শতকে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। রাজতরঙ্গিণী প্রণয়নে যে সকল আদর্শ এবং
প্রণালীর কথা তিনি উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা হইতে প্রমাণ হয় যে, সেযুগেও আধুনিক যুগের
ইতিহাস রচনার মূল সূত্রগুলি তাহাঁর অজ্ঞাত ছিল না’।
প্রাচীন ভারতের
ইতিহাসের উপাদান—
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের অনেক
উপাদান নানাস্থানে ছড়িয়ে আছে। যেমন—পুরাণের রাজবংশাবলীর বিবরণ, প্রশস্তি,
প্রত্নলেখ, মুদ্রা, প্রত্নতাত্ত্বিক অন্যান্য উপাদান, অশোকের লেখসমূহ,
সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি, ভোজ সম্পর্কে গোয়ালিয়র প্রশস্তি, পারমার রাজাদের
বিষয়ে রচিত উদেপুর প্রশস্তি প্রভৃতি, তাম্রলেখ, ভূমিদানপত্র প্রভৃতি থেকে ভারতের
সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের অনেক মূল্যবান্ তথ্য পাওয়া যায়।
ভারতবর্ষের যথার্থ ইতিহাস না
থাকলেও বেশ কিছু ঐতিহাসিক কাব্য রচিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল— বাণভট্টের
হর্ষচরিত, পদ্মগুপ্তের নবসাহসাঙ্কচরিত, কহ্লণের রাজতরঙ্গিণী, বিহ্লনের
বিক্রমাঙ্কদেবচরিত, হেমচন্দ্রের কুমারপালচরিত, জয়ানকের পৃথ্বীরাজবিজয়, সন্ধ্যাকরনন্দীর রামচরিত, বাক্পতিরাজের
গউড়বহো, নয়চন্দ্র সূরির হম্মীরকাব্য, চন্দ্রশেখরের শূর্জনচরিত, জহ্লণের
সোমপালবিলাস প্রভৃতি।
হর্ষচরিতে স্থাণীশ্বরের রাজা
হর্ষবর্ধনের, নবসাহসাঙ্কচরিতে ধারাধিপতি মুঞ্জের বৃত্তান্ত, রাজতরঙ্গিণীতে
কাশ্মীরের বিভিন্ন রাজাদের বৃত্তান্ত, বিক্রমাঙ্কদেবচরিতে চালুক্যবংশীয় রাজাদের
বৃত্তান্ত, কুমারপালচরিতে রাজা কুমারপালের বৃত্তান্ত, পৃথ্বীরাজবিজয়ে মধ্যযুগের শেষ হিন্দুরাজা পৃথ্বীরাজ এবং
তাঁর পূর্বপুরুষের বৃত্তান্ত, রামচরিতে পালবংশের রাজা রামপালের বৃত্তান্ত, গউড়বহো কাব্যে কনৌজের রাজা যশোবর্মার বৃত্তান্ত,
হম্মীরকাব্যে চৌহানবংশীয় রাজাদের এবং শূর্জনচরিতে সম্রাট আকবরের অনুগত শূর্জন নামক
রাজার বৃত্তান্ত, সোমপালবিলাসে কাশ্মীররাজ সোমপালের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এই
কাব্যগুলিতে ইতিহাসের অনেক উপাদান পাওয়া যায়।
উপসংহার— ইতিহাসের
যথাযথ বৈশিষ্ট্য বিচারে সংস্কৃত ঐতিহাসিক কাব্যগুলি হয়তো যথার্থ ঐতিহাসিক কাব্য
নয়, কবিগণের উদ্দেশ্য তা ছিল না। প্রাচীন আলোচকগণ মুনি-ঋষি, রাজা প্রভৃতি অন্যান্য
সকলের জীবনী আলোচনাকেই ইতিহাস বলেছেন। ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষের উপদেশযুক্ত অতীত
ঘটনাবলীই ইতিহাস। এর মধ্যে ধর্মনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির ইঙ্গিতও আছে। সংস্কৃত
ঐতিহাসিক কাব্যগুলি তৎকালীন ইতিহাসকে কাব্যের মাধ্যমে পরিবেশন করেছে। তাই এগুলি
একাধারে ইতিহাস ও কাব্য দুইই। ভারতীয় ঐতিহাসিক কাব্যের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে পণ্ডিত Winternitz বলেছেন— ‘The
Indian historical writing was always just a branch of poetry. Chronicles, in
which myths and history appear strongly amalgamated or biographical and
historical epics and novels or also poems written in praise of kings are mixed
up with historical or semi-historical topics.’
------
Comments
Post a Comment