বাচ্য (১)
বাচ্য (১)
বচ্ ধাতুর সঙ্গে ণ্যত্ প্রত্যয়যোগে বাচ্য শব্দটি নিষ্পণ্ন
হয়েছে। ‘বাচ্য’ শব্দের গঠন প্রক্রিয়া--
‘ভূবাদয়ো ধাতবঃ’ সূত্র দ্বারা ‘বচ্’ এর ধাতুসংজ্ঞা, ‘ধাতোঃ’,
ঋহলোর্ণ্যত্’, ‘প্রত্যয়ঃ’, এবং ‘পরশ্চ’ সূত্র দ্বারা বচ্ ধাতুর উত্তর ণ্যত্ প্রত্যয়ে ‘বচ্ ণ্যত্’, ণ্যত্-এর
তকার ও ণকার অনুবন্ধলোপে ‘বচ্ য’, ʻअचो ञ्णितिʼ সূত্র দ্বারা ব্ এর পরবর্তী
অকারের বৃদ্ধি হয়ে ‘বাচ্ য’ পরস্পর সংযোগে ‘বাচ্য’ শব্দটি নিষ্পণ্ন হয়। এরপর
ক্লীবলিঙ্গ প্রথমা একবচনে রূপ হয় ‘বাচ্যম্’।
বাচ্য শব্দের অর্থ বক্তব্য বিষয় বা
অভিধেয় বিষয়। যে বাক্যে ক্রিয়ার অভিধেয় বিষয় কর্তা তাকে কর্তৃবাচ্য, যে বাক্যে
ক্রিয়ার অভিধেয় বিষয় কর্ম তাকে কর্মবাচ্য, এবং যে বাক্যে ভাব বা ক্রিয়া নিজেকেই
প্রকাশ করে, তাকে ভাববাচ্য বলে।
আর এক ধরনের বাচ্য আছে যেখানে
ক্রিয়া কর্মের অন্তর্ভূত কর্তাকে প্রকাশ করে, এই ধরণের বাচ্যকে কর্ম কর্তৃবাচ্য
বলে।
সাধারণ নিয়ম—
১. কর্তৃবাচ্যে কর্তায় প্রথমা,
২. কর্মে দ্বিতীয়া এবং
৩. ক্রিয়াপদ কর্তার পুরুষ ও বচন
অনুসারে হয়।
যেমন—ছাত্রঃ পুস্তকং পঠতি। এই বাক্যে ‘ছাত্রঃ’ প্রথম পুরুষ একবচন, ক্রিয়াও প্রথম পুরুষের একবচনে হয়েছে। ‘পুস্তকং’ কর্ম, সেইজন্য তাতে দ্বিতীয়া বিভক্তি হয়েছে।
আবার ‘অহং পুস্তকং পঠামি’ বাক্যে ‘অহম্’ উত্তম পুরুষ একবচন, সেইজন্য ক্রিয়াপদও উত্তম পুরুষ একবচনের
হয়েছে। কর্মপদ পুস্তকে আগের মতোই দ্বিতীয়া হয়েছে।
এইরকম ‘ত্বং পুস্তকং পঠসি’ বাক্যে ‘ত্বম্’ মধ্যম পুরুষ একবচনের পদ, সেইজন্য ক্রিয়াপদও মধ্যম পুরুষ একবচনের
হয়েছে। কর্মপদ পুস্তকে আগের মতোই দ্বিতীয়া হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য-বিষয়ক কারিকাটি মনে রাখতে হবে—
‘কর্তৃবাচ্য-প্রয়োগে তু প্রথমা কর্তৃকারকে।
দ্বিতীয়ান্তং ভবেৎ
কর্ম কর্ত্রধীনং ক্রিয়াপদম্’।।
কর্মবাচ্য—
সাধারণ নিয়ম—
১. কর্মবাচ্যে কর্তৃকারকে তৃতীয়া
বিভক্তি,
২. কর্মপদে প্রথমা বিভক্তি এবং
৩. ক্রিয়াপদ কর্ম অনুসারী, অর্থাৎ
কর্ম যে পুরুষের যে বচন, ক্রিয়াও সেই পুরুষের সেই বচন হবে। কর্ম প্রথম পুরুষ বা
মধ্যম পুরুষ বা উত্তম পুরুষ একবচনের হলে ক্রিয়াও তাই হবে, দ্বিবচনের হলে ক্রিয়া
দ্বিবচনের হবে এবং বহুবচনের হলে ক্রিয়া বহুবচনের হবে। এখানে পুরুষ ও বচন উভয়
বিষয়েই মনোযোগ দিতে হবে।
৪. ধাতুতে আত্মনেপদের বিভক্তি হবে।
৫. ধাতুর উত্তর যক্ (য) প্রত্যয়
যুক্ত হবে।
যেমন—ময়া পুস্তকং পঠ্যতে। তেন
অশ্বাঃ দৃশ্যন্তে। যুষ্মাভিঃ বয়ং দৃশ্যামহে।
কারিকা—
কর্মবাচ্য-প্রয়োগে
তু তৃতীয়া কর্তৃকারকে।
প্রথমান্তং ভবেৎ
কর্ম কর্মাধীনং ক্রিয়াপদম্।।
ভাববাচ্য—
ভাব মানে ক্রিয়া। ভাববাচ্যে কর্ম
থাকে না। কর্তৃকারকে তৃতীয়া বিভক্তি এবং ক্রিয়া সবসময় প্রথম পুরুষের একবচন হয়। কেবলমাত্র
অকর্মক ধাতুরই ভাববাচ্যে প্রয়োগ হয়।
কারিকা—
ভাববাচ্যে
কর্মাভাবস্তৃতীয়া কর্তৃকারকে।
প্রথমপুরুষস্যৈকবচনং
স্যাৎ ক্রিয়াপদে।।
যেমন—শিশুনা শয্যতে। তেন গম্যতে।
ত্বয়া স্থীয়তে।
‘সার্বধাতুকে যক্’ (৩.১.৬৭)
সূত্রানুসারে ভাব ও কর্মবাচক সার্বধাতুক প্রত্যয় পরে থাকলে ধাতুর উত্তর যক্ হয়।
যক্ এর ক্ অনুবন্ধলোপে ‘য’ অবশিষ্ট থাকে।
‘টিত আত্মনেপদানাং টেরে’ (৩.৪.৭৯) সূত্র
দ্বারা টিত্ লকারের স্থানে আদেশপ্রাপ্ত আত্মনেপদী
প্রত্যয়ের টি-ভাগের স্থানে একার আদেশ হয়।
যুষ্মদ্ ও অস্মদ্ শব্দের দ্বারা
ভাবের সামানাধিকরণ্য হয় না, ফলে মধ্যম ও উত্তম পুরুষ ভাববাচ্যের বিষয় হয় না। ‘শেষে
প্রথমঃ’ (১.৪.১০৮) সূত্র দ্বারা প্রথম পুরুষই বিষয় হয়। ভাববাচ্যে প্রথম পুরুষের
সঙ্গেই লকারের সামানাধিকরণ্য থাকে।
তিঙ্ বাচ্য ক্রিয়া যেহেতু দ্রব্য
নয়, সেইজন্য তার কোন রূপ নেই। তাই দ্বিত্ব প্রভৃতির প্রতীতি হয় না। অর্থাৎ
ভাববাচ্যে একবচনই হয়, দ্বিবচন বা বহুবচন হয় না। কারণ একবচন সংখ্যার অপেক্ষা করে
না। প্রথম পুরুষের মতো একবচনও সামান্যরূপেই আসে।
(‘তিঙ্বাচ্যভাবনায়া অসত্ত্বরূপত্বেন
দ্বিত্বাদ্যপ্রতীতের্ন দ্বিবচনাদি। কি তু একবচনমেব’।(ভট্টোজি দীক্ষিত)
কর্মকর্তৃবাচ্য—
যেখানে কর্ম এত সহজে সম্পন্ন হয়
যে, মনে হয়—কর্তার সাহায্য ছড়াই কর্ম নিষ্পন্ন হয়েছে। এইরকম ক্ষেত্রে কর্ম পদটি
কর্তার মত মনে হয়। এইরকম কর্মকে কর্মকর্তা বলে।
কারিকা—
ক্রিয়মাণন্তু যৎ
কর্ম স্ব্যমেব প্রসিধ্যতি।
সুকরৈঃ স্বৈর্গুণৈঃ
কর্তুঃ কর্মকর্তেতি তদ্বিদুঃ।।
যেমন—বৃক্ষঃ স্বয়মেব ছিদ্যতে।
--গাছ নিজে নিজেই কাটা হচ্ছে। গাছ তো নিজেকে নিজে কাটতে পারে না।
বৃক্ষচ্ছেদনকর্তা এত সহজে গাছ কাটছে যে,
মনে হচ্ছে গাছ নিজে নিজেই কাটা হচ্ছে।
অন্যান্য উদাহরণ—ওদনঃ স্বয়মেব
পচ্যতে। কাষ্ঠং ভিদ্যতে। অন্নং পচ্যতে।
বাচ্যপরিবর্তনের
নিয়মাবলী—
১। কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে
পরিবর্তনের সময় কর্তায় তৃতীয়া বিভক্তি, কর্মে প্রথমা এবং ক্রিয়াপদকে কর্মের পুরুষ
ও বচন অনুসারে পরিবর্তিত করতে হবে।
অর্থাৎ কর্ম প্রথম পুরুষ বা মধ্যম পুরুষ বা উত্তম পুরুষ একবচনের হলে ক্রিয়াও
তাই হবে, দ্বিবচনের হলে ক্রিয়া দ্বিবচনের হবে এবং বহুবচনের হলে ক্রিয়া বহুবচনের
হবে। এখানে পুরুষ ও বচন উভয় বিষয়েই মনোযোগ দিতে হবে।
৪. ধাতুর উত্তর যক্ (য) প্রত্যয়
যুক্ত হবে। লট্, লোট্ লঙ্ ও বিধিলিঙ্ লকারে যক্ হবে। অন্যান্য লকারের ক্ষেত্রে
কেবলমাত্র আত্মনেপদের বিভক্তি হবে।
৫. ধাতুতে আত্মনেপদের বিভক্তি হবে।
‘তঙানাবাত্মনেপদম্’ (১.৪.১০০)
সূত্রানুসারে আত্মনেপদের নয়টি বিভক্তি হল—
ত আতাম্ ঝ; থাস্ আথাম্ ধ্বম্;
ইট্ বহি মহিঙ্।
এই বিভক্তিগুলি বিভিন্ন ব্যাকরণগত
প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়।
যেমন—- ‘টিত আত্মনেপদানাং টেরে’ (৩.৪.৭৯) সূত্র দ্বারা
টিত্ লকারের স্থানে আদেশপ্রাপ্ত
আত্মনেপদী প্রত্যয়ের টি-ভাগের স্থানে একার আদেশ হয়ে
‘ত’ হয়ে যায়— ‘তে’
আতাম্ --আতে;
ঝ—- অন্তে; (‘ঝোঽন্তঃ’ সূত্র দ্বারা ঝ্-স্থানে অন্ত্ আদেশ
হয় তারপর টি-ভাগ অকারের স্থানে একার আদেশ হয় )
থাস্-- সে (‘থাসঃ সে’ সূত্র
দ্বারা থাস্-এর জায়গায় ‘সে’ আদেশ হয়)
আথাম্--আথে (টি-আম্ এর স্থানে
একার আদেশ)
ধ্বম্-- ধ্বে (টি-অম্ এর স্থানে
একার আদেশ)
ইট্-- এ (ইট্ এর ট্
অনুবন্ধলোপের পর ইকারের স্থানে একার আদেশ)
বহি-- বহে ; (টি-ইকারের স্থানে
একার আদেশ)
মহিঙ্-- মহে।(টি-ইকারের স্থানে
একার আদেশ)।
‘সার্বধাতুকে যক্’ (৩.১.৬৭)
সূত্রানুসারে ভাব ও কর্মবাচক সার্বধাতুক প্রত্যয় পরে থাকলে ধাতুর উত্তর যক্ হয়।
যক্ এর ক্ অনুবন্ধলোপে ‘য’ অবশিষ্ট থাকে। এই ‘য’ পরে থাকলে গুণ বা বৃদ্ধি হয় না। হলন্ত বা ব্যঞ্জনান্ত এবং দীর্ঘ স্বরান্ত
ধাতুর ক্ষেত্রে ধাতু পরে ‘য’ যুক্ত হয় এবং তারপর আত্মনেপদের প্রত্যয় যুক্ত হয়।
যেমন—- লট্ লকারে প্রথম পুরুষ একবচনে—
গম্—গম্যতে, পঠ্—পঠ্যতে, ত্যজ্--ত্যজ্যতে, লভ্--লভ্যতে,
হন্--হন্যতে,
ভুজ্--ভুজ্যতে, নী—নীয়তে, জ্ঞা—জ্ঞায়তে,
সেব্-- সেব্যতে ইত্যাদি।
যক্ (য) পরে থাকলে ধাতুর রূপের
কিছু পরিবর্তন হয়।
১. রিঙ্ শয়গ্লিঙ্ক্ষু (৭.৪.২৮)
সূত্রানুসারে (শ-প্রত্যয়), যক্, (যকারাদি আর্ধধাতুক লিঙ্) পরে থাকলে ধাতুর ঋকারের
স্থানে রিঙ্ (রি) আদেশ হয়।
যেমন-- কৃ—ক্রিয়তে; ভৃ—ভ্রিয়তে; হৃ—হ্রিয়তে;
মৃ—ম্রিয়তে।
২. অযঙ্ যি কি্ঙতি’ (৭.১.২২)
সূত্রানুসারে কিত্ ঙিত্ যকারাদি প্রত্যয় পরে থাকলে শী ধাতুর ঈকারের স্থানে ‘অযঙ্’
আদেশ হয়। ‘অযঙ্’ এর য্ এর পরবর্তী ওকার উচ্চারণের জন্য এবং ঙ্ ইৎসংজ্ঞক, ফলে ‘অয্’
অবশিষ্ট থাকে।
যেমন—শী—শয্যতে।
৩. বচি-স্বপি-যজাদীনাং কিতি (৬.১.১৫) সূত্রানুসারে কিত্ (ক্ ইত্) প্রত্যয় পরে থাকলে বচ্,
স্বপ্, এবং যজাদিগণে পঠিত ধাতুর সম্প্রসারণ হয়।
‘ইগ্যণঃ’ সম্প্রসারণম্’ (১.১.৪৫) সূত্র দ্বারা য্-এর
স্থানে ইকার, ব্-এর স্থানে উকার, র্-এর স্থানে ঋকার এবং ল্-এর স্থানে লৃকার হয়।
যেমন—বচ্-- উচ্যতে; বদ্-উদ্যতে; বপ্-- উদ্যতে, বহ্--উহ্যতে; বস্--উষ্যতে;
স্বপ্--সুপ্যতে, যজ্--ইজ্যতে।
৪.
গ্রহি-জ্যা-বযি-বধি-বষ্টি-বিচতি-বৃশ্চতি-পৃচ্ছতি-ভৃজ্জতীনাং ঙিতি (৬.১.১৬)
সূত্রানুসারে কিত্ এবং ঙিত্ প্রত্যয় পরে থাকলে গ্রহ্, জ্যা, বেঞ্, ব্যধ্, বশ্,
ব্যচ্, ব্রশ্চ্, প্রচ্ছ্ ও ভ্রস্জ্ ধাতুর সম্প্রসারণ হয়। এখানে বহুল ব্যবহৃত
ধাতু গ্রহ্, প্রচ্ছ্ ও ব্যধ্ ধাতু। এগুলির সম্প্রসারণ হয়ে গ্রহ্ হয় ‘গৃহ্’,
প্রচ্ছ্ হয় ‘পৃচ্ছ্’ এবং ব্যধ্ হয় ‘বিধ্’। যেমন—গ্রহ্--গৃহ্যতে; প্রচ্ছ্--পৃচ্ছ্যতে;
বিধ্--বিধ্যতে।
----
Comments
Post a Comment