২. অর্থশাস্ত্রম্ (ভারতীয়ার্থসাস্ত্রস্য উৎপত্তিঃ ক্রমবিকাশশ্চ), C-9, Unit II
২. অর্থশাস্ত্রম্
(ভারতীয়ার্থসাস্ত্রস্য উৎপত্তিঃ
ক্রমবিকাশশ্চ)
(কিং তাবদ্ অর্থসাস্ত্রম্? সংস্কৃতভাষয়া রচিতানাম্
অর্থশাস্ত্রাণাং বিবরণং দীয়তাম্।)
উত্তরম্-- ‘অর্থশাস্ত্র’
শব্দটির আক্ষরিক অর্থ-- অর্থবিষয়ক
শাস্ত্র। কিন্তু বর্তমান কালের Economics বা
অর্থনীতিবিদ্যা থেকে এই শাস্ত্র একটু আলাদা। সংস্কৃতে অর্থশাস্ত্রের পরিধি অনেক
ব্যাপক। আচার্য কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন-- ‘মনুষ্যাণাং
বৃত্তিরর্থঃ মনুষ্যবতী ভূমিরিত্যর্থঃ। তস্যাঃ পৃথিব্যাঃ লাভপালনোপায়শাস্ত্রম্
অর্থশাস্ত্রম্ ইতি’। অর্থাৎ সম্পদ এবং সম্পদের অধিকারী
মানুষের ধাত্রী যে পৃথিবী সেই পৃথিবীর গ্রহণ এবং পালনের উপায় যে শাস্ত্রে উক্ত
হয়েছে, তাই অর্থশাস্ত্র।
প্রাক্কৌটিল্য
যুগের অর্থশাস্ত্রের বিবরণ—
কৌটিল্য
তাঁর অর্থশাস্ত্রে কয়েকজন প্রাচীন আচার্যের নাম উল্লেখ করেছেন। সেইসব আচার্য এবং
তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলি হল—
পৈতামহতন্ত্র-- মহাভারতের
সূত্রাধ্যায়ের বিবরণ অনুযায়ী পিতামহ ব্রহ্মা এক লক্ষ অধ্যায়যুক্ত এই বিশাল গ্রন্থ
রচনা করেন।
বৈশালাক্ষতন্ত্র-- আচার্য বিশালাক্ষ
পৈতামহতন্ত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে দশ হাজার অধ্যায়ে এই গ্রন্থ রচনা করেন।
বাহুদন্তকতন্ত্র-- আচার্য ইন্দ্র
বৈশালাক্ষতন্ত্রের সার অবলম্বন করে পাঁচ হাজার অধ্যায়ে এই গ্রন্থ রচনা করেন।
বার্হস্পত্যতন্ত্র-- আচার্য
বৃহস্পতি বাহুদন্তকতন্ত্রের সার সংগ্রহ করে তিন হাজার অধ্যায়ে এই গ্রন্থ রচনা
করেন।
উশনস্তন্ত্র-- আচার্য উশনস্
বা শুক্রাচার্য বার্হস্পত্যতন্ত্রের সার সংগ্রহ করে এক হাজার অধ্যায়ে এই গ্রন্থ
রচনা করেন।
কৌটিলীয়
অর্থশাস্ত্র—
প্রাচীন
ভারতীয় অর্থশাস্ত্র-বিষয়ক গ্রন্থাবলীর মধ্যে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র সর্বোৎকৃষ্ট।
এই গ্রন্থে মোট ১৫টি অধিকরণ এবং ১৫০টি অধ্যায় আছে। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষদিকে কৌটিল্য এই গ্রন্থ রচনা করেন।
একটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু বিন্যস্ত হয়েছে।শাসনব্যবস্থার
দুটি দিক-- তন্ত্র ও আবাপ।
কৌটিলীয়
অর্থশাস্ত্রের প্রথম পাঁচটি অধিকরণ তন্ত্রের অন্তর্গত। এগুলি হল—
১.
বিনয়াধিকারিক, ২. অধ্যক্ষপ্রচার, ৩. ধর্মস্থীয়, ৪. কণ্টকশোধন ও ৫. যোগবৃত্ত।
আবাপের
অন্তর্গত দশটি অধিকরণ হল—
৬.
মণ্ডলযোনি, ৭. ষাড়্গুণ্য, ৮. ব্যসনাধিকারিক, ৯. অভিযাস্যৎকর্ম, ১০. সাংগ্রামিক,
১১. সংঘবৃত্ত, ১২. আবলীয়স্, ১৩. দুর্গলম্ভোপায়, ১৪. ঔপনিষদ, ১৫. তন্ত্র-যুক্তি।
কৌটিলীয়
অর্থশাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয়—
রাজার
বিদ্যা ও বিনয়শিক্ষা, রাজা ও রাজ্যের সুরক্ষা, শাসনকার্যে বিভিন্ন বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত
অধ্যক্ষদের কর্তব্যনির্দেশ, দেওয়ানী ও ফৌজদারি আদালত সম্পর্কিত ব্যবহারবিধি,
দ্বাদশ রাজমণ্ডলের পারস্পরিক সম্পর্ক, সন্ধি, বিগ্রহ ইত্যাদি ষড়গুণের প্রয়োগ,
রাজা-অমাত্য প্রভৃতি সাতটি অঙ্গযুক্ত রাজ্যের বিপদ ও সঙ্কট, শত্রুর বিরুদ্ধে রাজার
অভিযান, যুদ্ধ, দুর্বলতর বিজিগীষু রাজার কর্তব্য, শত্রুর দুর্গ অধিকারের উপায়, অর্থশাস্ত্রের
ব্যাখ্যা, ন্যায় প্রভৃতি।
অর্থশাস্ত্রের
মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বিখ্যাত পণ্ডিত Winternitz
বলেছেন-- ‘The Kauṭilīya Arthaśāstra is a work of unique type and throws more light on
the cultural conditions and actual life of ancient India than any other work of
Indian literature does. This work has been considered of inestimable value.’
কৌটিল্য-পরবর্তী
যুগের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী—
কামন্দকীয়
নীতিসার-- কৌটিল্যের
অর্থশাস্ত্রের উপর ভিত্তি করে রচিত।লেখক কামন্দক সম্ভবতঃ খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে
(মতান্তরে ৭ম-৮ম শতকে) মহাকাব্যের আকারে গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থে ২০টি সর্গ
এবং ২৬টি প্রকরণ আছে।
কামন্দকীয়
নীতিসারের প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
প্রাচীন
আচার্যের অধীনে রাজার ইন্দ্রিয়জয় ও নিয়মানুবর্তিতা শিক্ষা, চতুর্বর্ণাশ্রমধর্ম,
আচরণবিধি, রাষ্ট্রের সাতটি অঙ্গের রক্ষা, সমাজের অপরাধ দমন, রাজা ও রাজপুত্রের
রক্ষা, রাজমণ্ডল, বিভিন্ন ধরনের চুক্তি, যুদ্ধাভিযান, কূটনীতিপ্রয়োগ, বন্ধুরাজাদের
রক্ষা, নীতিবিচার, দূতনিয়োগ, গুপ্তচর-নিয়োগ, সাম-দান-দন্ড-ভেদ নীতিচতুষ্টয়ের
প্রয়োগ, সৈন্যসমাবেশ, সেনা অভিযান, সৈন্যদের বিভিন্ন বিভাগের শক্তি ও দুর্বলতা,
সেনাধ্যক্ষের কর্তব্য, বিভিন্ন ধরনের কূটযুদ্ধ প্রভৃতি। Winternitz
কামন্দকীয় নীতিসারের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেছেন-- ‘The Nītisara of Kāmandakī or Kāmandaka is not only a work of an
altogether different kind. It is written not only in verse throughout, but in
fact, it is intermediate between a text-book and a work of didactical poetry.’
নীতিবাক্যামৃত--
জৈন
আচার্য সোমদেব সূরি (৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) ৩২টি সমুদ্দেশে এই গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থের
প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
ধর্ম, অর্থ, কাম, অরিষড়্বর্গ, বিদ্যাবৃদ্ধ,
আন্বীক্ষিকী-ত্রয়ী-বার্তা-দণ্ডনীতি, মন্ত্রী, পুরোহিত, সেনাপতি, দূত, গুপ্তচর,
বিচার, ব্যসন, রাজা, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ, বল, মিত্র, রাজ্যরক্ষা, রাজার
প্রাত্যহিক কর্তব্য, সদাচার, প্রজাদের আচরণ, বিভিন্ন প্রকার বিবাদ, ছয় প্রকার
বৈদেশিক নীতি (ষাড়্গুণ্য), যুদ্ধ প্রভৃতি।
সোমদেব মূলতঃ কৌটিল্যকেই অনুসরণ করেছেন।
কামন্দকের মতো তিনিও শাসনসংক্রান্ত আলোচনা পরিহার করে রাজাদের অনুসরণীয়
প্রজাপালন-বিষয়ক নীতির আলোচনাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। নীতিবাক্যামৃতের
মূল্যায়ন প্রসঙ্গে Winternitz
বলেছেন-- ‘It is not
like the Arthaśāstra of Kauṭilya, a practical hand-book of politics
and economics, but it is rather a
pedagogical work that contains fine counsels for the king.’
শুক্রনীতিসার--
কৌটিল্যের
অর্থশাস্ত্রকে অবলম্বন করে রচিত আর একটি গ্রন্থ শুক্রনীতিসার । মধ্যযুগের জনৈক শুক্রাচার্য এই গ্রন্থ রচনা
করেন। এখানে চারটি অধ্যায় আছে এবং সর্বশেষ অধ্যায়ে সাতটি প্রকরণ আছে। এই গ্রন্থের
প্রধান প্রধান আলোচ্য বিষয়—
রাজপুত্র এবং রাজার কর্তব্যকর্ম, রাষ্ট্রের
অন্যান্য পদাধিকারিকদের কর্তব্য, রাজা ও তাঁর অনুসরণীয় নীতিসমূহ, রাজার মিত্রদের
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, রাজকোষ, বিজ্ঞান ও কলাবিদ্যা, প্রথা ও প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন
প্রকার দুর্গ, সেনাবাহিনী, রাষ্ট্রীয় পরিষদ, মন্ত্রী, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ,
বিচারব্যবস্থা, আন্তঃরাষ্ট্রনীতি, প্রযুক্তিবিদ্যা, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম,
আচরণবিধি, নীতিশিক্ষা, বিভিন্ন ধরনের বিদ্যা, কথা, সাহিত্য, অর্থনীতির
বিষয়সমূহ-- পরিসংখ্যান, মূল্য, মজুরী
প্রভৃতি।
শুক্রনীতিসারে
রাজনীতি, অর্থনীতি, সাধারণ নীতি এবং সামাজিক বিষয়সমূহ আলোচিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে একে Socio-political এবং Socio-economic শ্রেণীর
রচনা বলা যায়।
লঘ্বন্নীতিশাস্ত্র— জৈন আচার্য হেমচন্দ্র (১০৮৮-১১৭২ খ্রিষ্টাব্দ)
এই গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি প্রাকৃত ভাষায় রচিত ‘বৃহদর্হন্নীতিশাস্ত্র’
গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে লেখা।গ্রন্থটি শ্লোকাকারে লেখা, মাঝে মাঝে গদ্যরচনাও আছে।
গ্রন্থের অল্প অংশ রাজনীতি-বিষয়ক এবং অধিকাংশ শাসননীতি ও দণ্ডনীতি-বিষয়ক আলোচনায়
পূর্ণ।
উপসংহার--
প্রাচীন
ভারতীয় অর্থশাস্ত্রকারদের দৃষ্টিভঙ্গী অনেক বাস্তব। পার্থিব জীবনকে সুখী ও সমৃদ্ধ
করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার তত্ত্বগত ও প্রয়োগগত কৌশল তাঁরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে
আলোচনা করেছেন। রাজ্যপরিচালনার মূলনীতি, শাসকের শিক্ষণীয় বিষয়, আচার-আচরণ,
রাজনীতির মূলকথা, দণ্ডনীতি, অর্থনীতির মূলকথা প্রভৃতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতীয়
অর্থশাস্ত্রকারদের চিন্তাভাবনা এখনও প্রাসঙ্গিক।
-----
Comments
Post a Comment