৬. পরাশরসংহিতা, ৭। কৌটিলীয়ম্ অর্থশাস্ত্রম্ — (C-9, Unit-II)
৬. পরাশরসংহিতা— (C-9, Unit-II)
ভূমিকা-- মনুসংহিতা ও যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতার পরেই বিখ্যাত
স্মৃতিশাস্ত্রগ্রন্থ পরাশরসংহিতা। ঋষি পরাশর এর রচয়িতা। সংহিতার রচয়িতা পরাশর ঋষি
বশিষ্ঠের পৌত্র এবং শক্তির পুত্র। বৈদিক মন্ত্রের দ্রষ্টাও পরাশর ঋষি। তবে এই দুজন
পরাশর এক ব্যক্তি নন। পরাশর অত্যন্ত প্রতিভাবান্ ও মেধাবী ছিলেন। শৈশবেই তিনি
বেদবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। পণ্ডিতগণের মতে-- পরাশরসংহিতা খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের কাছাকাছি
সময়ে রচিত হয়। গ্রন্থটিতে বারোটি অধ্যায় এবং ৫৯২টি শ্লোক আছে।
পরাশরসংহিতার বিষয়বস্তু—
প্রথম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়-- সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলিযুগের
মানুষের ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, দানধর্ম, অতিথিসেবা প্রভৃতি।
দ্বিতীয় অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়-- ব্রাহ্মণাদি চার বর্ণ এবং ব্রহ্মচর্যাদি চার আশ্রমের
ধর্ম। পরাশর ব্রাহ্মণদেরও কৃষিকাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন-- ‘ষট্কর্মনিরতো বিপ্রঃ কৃষকর্মাণি কারয়েৎ’।
ব্রাহ্মণকে ধান্য, কাষ্ঠ, তৃণ প্রভৃতি বিক্রয়ের কথা বলা
হয়েছে-- ‘বিপ্রস্যৈবংবিধা বৃত্তিস্তৃণকাষ্ঠাদি-বিক্রয়ঃ’।
পরাশর বৈশ্য ও শূদ্রদের কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং
শিল্পকর্ম করার পরামর্শ দিয়েছেন—
‘বৈশ্যঃ শূদ্রঃ সদা কুর্যাৎ কৃষবাণিজ্য-শিল্পকম্’।
তৃতীয় অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
জন্ম ও মরণের অশৌচ এবং তা থেকে শুদ্ধির উপায়।
চতুর্থ অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়-- সংসারে
পতি-পত্নীর কর্তব্য, বিভিন্ন প্রকার পুত্র, বিধবা নারীর জীবনযাত্রা প্রভৃতি। পরাশর
বিধবা-বিবাহের কথাও বলেছেন—
‘নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে পতিতে পতৌ।
পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্যো বিধীয়তে’।।
পঞ্চম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
শেয়াল কুকুরের কামড়ে অশুদ্ধি এবং তা থেকে শুদ্ধির বিধান।
ষষ্ঠ অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
হাঁস, মুরগী, বক, কাক, টিয়া, তিতির প্রভৃতি পাখি হত্যার পাপ, হরিণ, বাঘ,
ভালুক, সিংহ, হাতী, ঘোড়া প্রভৃতি প্রাণী হত্যার পাপ এবং সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত
বিধান, ব্রাহ্মণাদি বর্ণের বিভিন্ন ধরণের
পাপ এবং তার প্রায়শ্চিত্তের বিধান।
সপ্তম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যশুদ্ধি, শৌচ ও অশৌচ বিচার।
অষ্টম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
কায়িক, বাচিক ও মানসিক পাপকর্ম স্বীকার, তার প্রায়শ্চিত্ত, প্রায়শ্চিত্ত
বিধানকারী ব্রাহ্মণের যোগ্যতা, গোহত্যার পাপ ও তার প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি।
নবম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়-- গরুকে
বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করা ও আঘাত করার প্রায়শ্চিত্ত, গোহত্যার ধরণ অনুসারে
প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি।
দশম অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
বিভিন্ন ব্যভিচারের প্রায়শ্চিত্ত।
একাদশ অধ্যায়-- নিষিদ্ধ দ্রব্য, নিষিদ্ধ দ্রব্যভক্ষণে প্রায়শ্চিত্ত,
নিষিদ্ধ ভোজনের প্রায়শ্চিত্তের জন্য নানা ধরণের ব্রত অনুষ্ঠান প্রভৃতি।
দ্বাদশ অধ্যায়-- মূল আলোচ্য বিষয়--
বিভিন্ন প্রকার শুদ্ধির জন্য ব্রত, স্নানের বিধান, পিতৃতর্পণ, আচমন,
ব্রহ্মহত্যাদি পাতকের প্রায়শ্চিত্ত প্রভৃতি।
মূল্যায়ন-- পরাশরসংহিতা প্রাচীন ভারতের সামাজিক বিধিবিধান, রীত-নীতি,
আচার-অনুষ্ঠান বিষয়ে এক মূল্যবান্ গ্রন্থ। এখানে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত
প্রতিটি পর্যায়ের অনুষ্ঠেয় বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে
মনুপ্রবর্তিত অনেক নিয়মের একটু বিস্তৃতি সহকারে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। হিন্দু
পারিবারিক ও সামাজিক আইন-কানুন, নানা ধরণের অপরাধ এবং তার প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কিত
বিধান অত্যন্ত নিপুণভাবে আলোচিত হয়েছে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমানোর জন্যই পরাশরের
এই প্রচেষ্টা। তিনি বর্ণপ্রথা পুরোপুরি সমর্থন করেছেন। বিধবা বিবাহে পরাশর অনেক
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পরাশরের
ব্যবস্থা অনুসরণ করেই বিধবা বিবাহ প্রচলন করেন। অতএব ভারতবর্ষের সামাজিক অবস্থার
উন্নয়নে পরাশরের যে কার্যকরী ভূমিকা আছে তা অনস্বীকার্য।
----
৭। কৌটিলীয়ম্ অর্থশাস্ত্রম্ (C-9, Unit II)
উত্তরম্-- ‘অর্থশাস্ত্র’
শব্দটির আক্ষরিক অর্থ-- অর্থবিষয়ক শাস্ত্র। কিন্তু
বর্তমান কালের Economics বা
অর্থনীতিবিদ্যা থেকে এই শাস্ত্র একটু আলাদা। সংস্কৃতে অর্থশাস্ত্রের পরিধি অনেক
ব্যাপক। আচার্য কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রের ব্যাখ্যায় বলেছেন-- ‘মনুষ্যাণাং
বৃত্তিরর্থঃ মনুষ্যবতী ভূমিরিত্যর্থঃ। তস্যাঃ পৃথিব্যাঃ লাভপালনোপায়শাস্ত্রম্
অর্থশাস্ত্রম্ ইতি’। অর্থাৎ সম্পদ এবং সম্পদের অধিকারী
মানুষের ধাত্রী যে পৃথিবী সেই পৃথিবীর গ্রহণ এবং পালনের উপায় যে শাস্ত্রে উক্ত
হয়েছে, তাই অর্থশাস্ত্র।
কৌটিলীয়
অর্থশাস্ত্রের বিবরণ—
প্রাচীন
ভারতীয় অর্থশাস্ত্র-বিষয়ক গ্রন্থাবলীর মধ্যে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র সর্বোৎকৃষ্ট।
এই গ্রন্থে মোট ১৫টি অধিকরণ এবং ১৫০টি অধ্যায় আছে। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষদিকে কৌটিল্য এই গ্রন্থ রচনা করেন।
একটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করে এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু বিন্যস্ত হয়েছে।শাসনব্যবস্থার
দুটি দিক-- তন্ত্র ও আবাপ।
তন্ত্র-- প্রজাদের যাতে
অলব্ধ বস্তুর লাভ হয় এবং লব্ধ বস্তুর রক্ষা হয় সেদিকে লক্ষ রেখে শাসনকার্য
পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় এই অংশে আলোচিত হয়েছে।
আবাপ-- কাছাকাছি এবং
দূরবর্তী পররাষ্ট্রের রাজাদের কার্যকলাপ জানা এবং প্রয়োজনে সন্ধি, বিগ্রহ প্রভৃতির
মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে সংক্রান্ত বিষয়গুলি এই অংশে আলোচিত হয়েছে।
কৌটিলীয়
অর্থশাস্ত্রের প্রথম পাঁচটি অধিকরণ তন্ত্রের অন্তর্গত। এগুলি হল—
১.
বিনয়াধিকারিক, ২. অধ্যক্ষপ্রচার, ৩. ধর্মস্থীয়, ৪. কণ্টকশোধন ও ৫. যোগবৃত্ত।
এগুলির
বিষয়বস্তু নিম্নরূপ—
১.
বিনয়াধিকারিক-- এই
অধিকরণে রাজার বিদ্যা ও বিনয়শিক্ষা, অমাত্যনিয়োগ, দূতনিয়োগ, গুপ্তচরনিয়োগ,
আত্মরক্ষা, ইন্দ্রিয়জয়, রাজ্যের সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
২.
অধ্যক্ষপ্রচার-- এই
অংশে শাসনবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ২২জন অধ্যক্ষের কর্তব্যনির্দেশ করা হয়েছে। এদের
মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-- কোষাধ্যক্ষ,
আকরাধ্যক্ষ, সুবর্ণাধ্যক্ষ, পণ্যাধ্যক্ষ, আয়ুধাগারাধ্যক্ষ, শুল্কাধ্যক্ষ,
সুরাধ্যক্ষ, গণিতাধ্যক্ষ, অশ্বাধ্যক্ষ, হস্ত্যধ্যক্ষ, রথাধ্যক্ষ প্রমুখ।
৩.
ধর্মস্থীয়-- এখানে প্রধানতঃ দেওয়ানী আদালত
সম্পর্কিত ব্যবহারবিধির কথা বলা হয়েছে। এই অংশের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি
হল-- ব্যবহারবিধি, স্ত্রীধন, দায়ভাগ,
উপনিধি, বেতনাদান, ক্রীতানুশয়, বাক্পারুষ্য, দণ্ডপারুষ্য প্রভৃতি বিষয়ে
ব্যবহারবিধি।
৪.
কণ্টকশোধন-- এই
অংশের মূল আলোচ্য বিষয়-- ফৌজদারী
ব্যবহারবিধি। সমাজে সঙ্ঘটিত বিভিন্ন অপরাধ বিষয়ে মামলা-মোকদ্দমা সংক্রান্ত বিবাদের
নিষ্পত্তির বিধান এই অংশে দেওয়া হয়েছে।
৫.
যোগবৃত্ত-- এই
অংশে প্রধানতঃ গুপ্তচর-নিয়োগ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আবাপের
অন্তর্গত দশটি অধিকরণ হল—
৬.
মণ্ডলযোনি, ৭. ষাড়্গুণ্য, ৮. ব্যসনাধিকারিক, ৯. অভিযাস্যৎকর্ম, ১০. সাংগ্রামিক,
১১. সংঘবৃত্ত, ১২. আবলীয়স্, ১৩. দুর্গলম্ভোপায়, ১৪. ঔপনিষদ, ১৫. তন্ত্র-যুক্তি।
আবাপের
বিষয়বস্তু—
৬.
মণ্ডলযোনি-- এই
অংশে দ্বাদশ রাজমণ্ডলের পারস্পরিক সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে।
৭.
ষাড়্গুণ্য-- এই
অংশে সন্ধি, বিগ্রহ, যান, আসন, দ্বৈধীভাব ও সংশ্রয়-- এই ছয়টি গুণের আলোচনা করা
হয়েছে।
৮.
ব্যসনাধিকারিক-- এই
অংশে রাজা, অমাত্য, কোষ, বল প্রভৃতি সাতটি অঙ্গযুক্ত রাজ্যের বিপদ ও সঙ্কট
সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
৯.
অভিযাস্যৎকর্ম-- এই
অংশে শত্রুর বিরুদ্ধে রাজার অভিযানের কাল, কৌশল প্রভৃতি বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে।
১০.
সাংগ্রামিক-- এই অংশে বিভিন্ন প্রকার যুদ্ধ এবং
সেই সংক্রান্ত নীতি ও কৌশল আলোচিত হয়েছে।
১১.
সংঘবৃত্ত-- এই
অংশে সঙ্ঘ অর্থাৎ শ্রেণী প্রভৃতি প্রতি রাজার আচরণ সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
১২.
আবলীয়স্-- এই
অংশে অবলীয়ান্ বা কম শক্তিসম্পন্ন বা দুর্বলতর অথচ জয়লাভ করতে ইচ্ছুক এমন রাজার
করণীয় বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
১৩.
দুর্গলম্ভোপায়-- এই
অংশে শত্রুদুর্গ অধিকারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
১৪.
ঔপনিষদ-- এই
অংশে পরোক্ষভাবে শত্রুজয়ের গোপন রহস্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
১৫.
তন্ত্র-যুক্তি-- এই
অংশে অর্থশাস্ত্রের ব্যাখ্যা, ন্যায় প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
উপসংহার-- কৌটিল্যের
অর্থশাস্ত্র প্রাচীন ভারতে প্রবর্তিত রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি
প্রভৃতি বিষয়ে এক মূল্যবান্ দলিল। কৌটিল্য রাজার কর্তব্য এবং আচরণ সম্বন্ধে যা
বলেছেন তা যে কোন দেশের শাসকের পক্ষে অনুসরণীয়। শাসনকার্যের বিভিন্ন বিভাগের
সুষ্ঠু কাজের বিষয়ে তিনি যা বলেছেন তার প্রাসঙ্গিকতা এখনও অস্বীকার করা যায় না।
অন্যান্য সামাজিক ব্যবস্থা বিষয়ে তিনি যা বলেছেন তা তৎকালে প্রচলিত ধর্মশাস্ত্রের
বিধি-বিধান থেকে ভিন্ন কিছু নয়। সামগ্রিক বিচারে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র প্রাচীন
ভারতীয় ধ্যান-ধারণার অত্যন্ত সমৃদ্ধ গ্রন্থ। অর্থশাস্ত্রের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে
বিখ্যাত পণ্ডিত Winternitz
বলেছেন-- ‘The Kauṭilīya Arthaśāstra is a work of unique type and throws more light on
the cultural conditions and actual life of ancient India than any other work of
Indian literature does. This work has been considered of inestimable value.’
-----
Casino - Jammyhub
ReplyDeleteCasino 고양 출장안마 - JAMMY HOCKEY, HOCKEY (MARKIE HOCKEY) 강원도 출장마사지 Casino 춘천 출장안마 - Jammyhub.com. Address :: 4000, 통영 출장안마 MARYS, 강원도 출장마사지 England.